হোম সাহিত্য ও সংস্কৃতি শিশুর বিকাশে আমাদের স্নেহ ও ভালোবাসা

শিশুর বিকাশে আমাদের স্নেহ ও ভালোবাসা

মোহাম্মদ হারুন মিয়া || সহকারী পরিচালক 27 Mar, 2021 12:45 PM

শিশুর-বিকাশে-আমাদের-স্নেহ-ও-ভালোবাসা-2021-03-27-605ed47f966b3.png

সময় এবং নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সে তার আপন গতিতে চলতেই থাকে। শত চেষ্টা করেও তাকে দমানো যায় না। তাই সময় কাল থেকে কালান্তরে চলছেই। এমনি করে সময় গড়িয়ে যায়। সময় গড়িয়ে আহবান করে ভবিষ্যতকে। ভবিষ্যতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা, কামনা-বাসনা-ভাবনা সবার কাম্য, সবার মধ্যেই বিরাজ করে।

ভবিষ্যতকে নিয়েই মানুষের স্বপ্ন ও যতো কল্পনা-জল্পনা, আশা-আাকাঙ্খা। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের হাল ধরবে কারা? আজকের শিশু যারা তারা। তাদের হাতেই পরিচালিত হবে আগামী ভবিষ্যত। প্রত্যেকটি শিশুর মণিকোঠায় ঘুমন্ত অবস্থায় আছে হাজার আশা-আকাঙ্খা। আর সেই আশাকে বিকশিত, বাস্তবায়িত ও প্রস্ফুটিত করার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সকলের। আমাদের গড়ে তুলতে হবে তাদের জন্যে প্রত্যাশিত সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ, সমাজ ব্যবস্থা। এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাদের, মানুষ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে। যে সমাজে বাস করে তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। গড়ে উঠবে দেশের সম্পদ হয়ে। মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে তারা, যারা আজকের শিশু।  দেশ নির্ভর করছে তাদের উপর, তাদের নেতৃত্বের উপর। তাদের বিবেকের উপর। 

আজ আমাদের সমাজের শিশুরা বিভিন্নভাবে লাঞ্চিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত। অনাদরে, অবহেলায় তারা বিকশিত হচ্ছে। সমাজের অবহেলিত শিশুদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। তাদের সুপথে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা, একটু সহানুভূতি, একট ুসহযোগিতা। একটু সহযোগিতায় তারা বড় হবে, গড়বে তাদের জীবন কাঠামো। ফুলে-ফলে বিকশিত হবে তাদের পুরো জীবন ব্যবস্থা। সমাজের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের রক্ষার জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে। 

একটি শিশু নিষ্পাপ হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। কালিমার রেশমাত্রও তার মধ্যে থাকে না। জন্মের পর একটি শিশু অসহায় থাকে। পৃথিবী সম্পর্কে তার কোনো ধারনা থাকে না। পৃথিবীকে সে চেনে না, জানে না। জন্মের পর সে পৃথিবী সম্পর্কে আস্তে আস্তে অবগত হতে থাকে, বড় হতে থাকে। পৃথিবীর আলো-বাতাস, আবহাওয়া, গতি-প্রকৃতি সবকিছুই তাকে আচ্ছন্ন করে। তাকে প্রতিনিয়তই হানা দেয়। সে পৃথিবীর সবকিছু সম্পর্কে বুঝতে পারে। যে আজকের শিশু। একটি অবুঝ শিশু।

পৃথিবীতে আপন বলতে সে শুধু তখন মা-বাবাকেই কাছে পায়। তাদেরকেই সে আপনজন মনে করে। সে সময় যদি মা-বাবা হতে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন তার তত্ত¡াবধান না করে তাহলে সে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।  এই বড় হওয়ার পেছনে তার অভিভাবকদের আদর-যতœ, ভালোবাসা ও তত্ত¡াবধান তার প্রাপ্য। কারণ আজকে যারা  বড় তারাও জন্মের পর তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে এ আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছিলো। এই অনুভব ও ব্যাকুলতা আমাদের সবার মধ্যে বিরাজ আছে। 

একটি শিশুকে লেখাপড়া করিয়ে শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে প্রয়োজন। আর এ গুরুদায়িত্ব মা-বাবার। শিশুদের  প্রতি অবহেলা, উপেক্ষা করা উচিত নয়, এটি অমানবিককতারই নামান্তর। শিশুকে বিকশিত করতে নরম গলায়, আদর যতেœ ও বুঝিয়ে কাজ আদায় করতে হয়। শুধুমাত্র শাসন করেই কাজ আদায় করা যায় না। তাদের থেকে ভালো কোনো কাজ আদায় করতে শারীরিক শাস্তি দিয়েই যে আদায় করা যাবে এমনটি নয়। সে যেভাবে চায়, সেভাবে কথায়, আচরণে রাজি করিয়ে কাজ আদায় করতে হয়। কাজ করতে না পারলে তাকে শাস্তি দিলেই যে কাজটি আদায় হয়ে যাবে এমনটিও নয়। বরং শাস্তি অনেক সময় শিশুমনে দাগ কাটে। তাকে জেদি করে। এক সময় সে প্রতিবাদী হয়ে উঠে। আমরা অনেক অভিভাবক আছি শিশুরা অপরাধ করলে তার সহপাঠিদের সামনে, অন্যান্য শিশুদের সামনে শাস্তি দিয়ে থাকে। এটি মোটেও উচিত নয়। কারণ শিশুটির স্কুলের বন্ধু কিংবা খেলার সাথিদের সামনে শাস্তি দিলে তার আত্মসম্মানে আঘাত হানে এবং আত্মমর্যাদার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তার মনে কষ্টের সূচনা কর।  এটা সে মনে রাখে। ফলে শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে এটি সমস্যার সৃষ্টি  করে। 

আমাদের পরিবেশ প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের অনেক কিছু শেখায়। পরিবেশ যদি শিক্ষিত, সুন্দর হয় তাহলে আমাদের জীবন সুন্দর ও উন্নত হবে। এটাই স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি একটি শিশুর শিক্ষা ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যে পরিবেশে শিশু অবাধে তার মতামত, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা প্রকাশ করতে পারে, মিশতে পারে, চলতে পারে, খেলতে পারে, বিচরণ করতে পারে উন্মুক্ত বিহঙ্গের মতো, যেখানে থাকবেন না কোনো পরাধীনতা, থাকবে না কোনো সংকীর্ণতা, জড়তা। স্বেচ্ছায় নিজেকে যেখানে-সেখানে উপস্থাপন করতে পারে সেই পরিবেশে সে অবশ্যই উন্নত হয়ে বেড়ে উঠেবে। সকল প্রকার মানসিক ও শারীরিক সহিংসতামুক্ত হলে শিশু অবশ্য মেধাসম্পন্ন হবে। 

একটি শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তার মা-বাবার শিক্ষাই প্রধান। আর এ জন্য মাকে প্রথম শিক্ষক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবেশও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিশুর বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে শিশুর প্রতিপালন ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, দুর্ব্যবহার, অবহেলা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা বা অমনোযোগি আচরণ ও শারীরিক-মানসিক হিংস্রতা থেকে শিশুকে মুক্ত রাখতে হবে। তাকে অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। তাহলেই সে নি:সঙ্কুচে, নি:ভয়ে, নিবিঘেœ বেড়ে উঠবে। 

একটি শিশু বিকশিত হওয়ার পেছনে পরিবারের প্রধান লক্ষ্য থাকবে শিশুর ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে পরিপূণর্তা বিকাশ। এর ফলে শিশুর মা-বাবা, নিজের সাংস্কৃতিক সত্ত¡া, ভাষা ও মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠবে। শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এমন কিছু থেকে শিশুকে নিরাপদ রাখার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। 

শিশুর কাছ থেকে সব সময় নিখুঁত আচরণ আশা করা উচিত নয়। সে  মাঝে  মধ্যে এমন কিছু আচরণ করে ফেলে যা আপত্তিকর এবং বেমানান। যা কারোরই প্রত্যাশিত নয়। তার আচরণে আমাদের খারাপ লাগতে পারে, মনে হতে পারে অনেক কিছু। শিশুটি অবুঝ বিধায় সে এ বিষয়টিকে তার ভাবনার জগতে আনে না। মাঝে মাঝে সে অনেক শিশুকে গালি দেয়, তখন বুঝতে হবে সে এই গালি বড়দের কাছ থেকেই শুনেছে। সে হয়তো মনে করে এটাও একটি ভাষা। সে যা শুনে, দেখে এবং বুঝে তাই করার চেষ্টা করে মাত্র। সে অবলীলায় এসব গালি ব্যবহার করে। তার গালি শুনে আমরা তাকে বকাবকি করি, মারধর করি কিংবা অন্য কোনো শাস্তি দিই। এমনটি করাও ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে সে শিশু, শুধুই শিশু, অবুঝ শিশু। 

একটি শিশুকে পরিপূর্ণ সম্ভাবনাময় শিশু হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব মা-বাবাসহ পরিবারের সকলের। মেয়ে শিশু, প্রতিবন্ধি শিশু, পরিবার বিচ্ছিন্ন শিশু, সুবিধা বঞ্চিত শিশু, নির্যাতিত শিশু, নিপীড়ন শিশু, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু প্রভৃতি শ্রেণীর শিশু আমাদের সমাজে বিরাজমান। প্রত্যেক শিশুর প্রতি আমাদের সমান দায়িত্ব পালন করা উচিত। 

আমাদের সমাজে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে দু প্রকারের শিশুরা- তারা হচ্ছে ক. কাজের মেয়ে বা ছেলে খ. রাস্তার শিশু (যারা টোকাই বলে পরিচিত)। যেসব শিশু বাসাবাড়িতে কাজ করে তারা সাধারণত রান্নাঘরে কিংবা ঘরের মেঝেতে ঘুমোয়। তাদের খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছেদও থাকে নিম্নমানের। সব সময় তাদেরকে উপেক্ষা করা হয়। পরিবারের একটু আধটু কিছু হলেই তাদের উপর নেমে আসে অমানসিক, অবর্ণনীয়, অকল্পণীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তারা ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা পায় না। তারা সব সময় অবহেলার স্বীকার। নির্যাতনের পাত্র। তারা সর্বদা নিগৃহীত-সুযোগ বঞ্চিত শিশু। পুলিশের পিটুনি, পথচারির দুর্ব্যবহার নিয়ে তারা বেঁচে থাকে, জীবনযাপন করে। এটি সত্যিই হতাশাজনক। এটা সভ্য মানব জাতির জন্য এক কলঙ্ক। কেননা আমরা সুরম্য এসি অট্রালিকায় বাস করে, দামি এসি গাড়িতে চড়লেও এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই যে, ওই শিশুরা এ মানবজাতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানব জাতিরই সন্তান। রক্তেমাংসে গড়া মানুষ। কোনো উপাদান তার শরীরে কম নেই। নিজ বাসার কাজের লোকটিই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। 

বর্তমান যুগ যান্ত্রিক যুগ। এ যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে আমরা সবাই ব্যস্ত। আমাদের আদরের সোনামণিরা প্রতিদিনই আমাদের সাথে সময় কাটায়, কথা বলে, আদর পায়, স্নেহ-ভালোবাসা, প্রেম-মায়া-মমতা পায়। কিন্তু ঐ শিশুটিতো তা থেকে বঞ্চিত। তার হয়তো মা-বাবা আছে, কিংবা নেই। থাকলেও হতদরিদ্র বিধায় পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে, পেটের দায়ে বাসায় কাজ করতে আসে। আর সেই শিশুগুলোর প্রতি আমরা যদি কঠোর ও গোমরামুখি হই সেই প্রভাব অবশ্য আমাদের সোনামণিদের উপরই পড়বে। একটু আদর-ভালোবাসা আর কিঞ্চিত যতেœই তারা বিকশিত হয়ে উঠতে পারে ফুলের মতো। 

আসুন, আমরা সকলে মিলে প্রতিটি শিশুর শারীরিক বুদ্ধি ও পুষ্টির নিশ্চয়তাসহ আদর-যতœ, ভালোবাসা ও সার্বিক সুন্দর পরিবেশ দিয়ে তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে সুনিÐিত করি। কারণ, তাদের চোখে আছে আলো, আছে বাসনা-প্রেরণা, দেহে আছে শক্তি, মনে আছে বল, আর চেতনায় আছে প্রত্যাশা। আছে পাওয়ার আশা, না পাওয়ার বেদনা। সেই প্রত্যাশাকে পূরণ করার দায়িত্ব আমার, আপনার ও আমাদের সকলের।

ভালোবাসার বন্ধনে শিশুদের বিকশিত করে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি। ফুলে-ফলে রাঙিয়ে তুলি তাদের জীবনকে। শোভিত করি তাদের পুরো জীবনব্যবস্থাকে। তাহলেই আজকের শিশু হবে আগামী দিনের সুযোগ্য নাগরিক।
 


আরও :

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

আরও সংবাদ